এস এম সুলতান

শেখ মোহাম্মদ সুলতান, (১০ আগস্ট ১৯২৩ - ১০ অক্টোবর ১৯৯৪) যিনি এস এম সুলতান নামে সমধিক পরিচিত, ছিলেন একজন বাংলাদেশি প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী।[1][2] তার জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং কৃষিকাজের মধ্যে। আবহমান বাংলার সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তার শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। তার ছবিতে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণির দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির হালও অনেকটা ফুটে উঠেছে। তার ছবিগুলোতে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমা উঠে এসেছে এবং কৃষককে এই কেন্দ্রের রূপকার হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তিনি ছিলেন একজন সুরসাধক এবং বাঁশিও বাজাতেন।[3] ১৯৮২ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট এবং এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে ম্যান অব এশিয়া পুরস্কার লাভ করেন। একই বছর তিনি একুশে পদক পান।[4]

এস এম সুলতান
আত্মপ্রতিকৃতি
জন্ম
লাল মিয়া

(১৯২৩-০৮-১০)১০ আগস্ট ১৯২৩
মৃত্যু১০ অক্টোবর ১৯৯৪(1994-10-10) (বয়স ৭১)
সমাধিনড়াইল
জাতীয়তাবাংলাদেশী
অন্যান্য নামলাল মিয়া
নাগরিকত্ববাংলাদেশ
মাতৃশিক্ষায়তনকলকাতা আর্ট স্কুল
পেশাচিত্রশিল্পী
কর্মজীবন১৯৪৬-১৯৯৪
আদি নিবাসনড়াইল
পিতা-মাতা
  • শেখ মোহাম্মদ মেসের আলী (বাবা)
পুরস্কারএকুশে পদক
স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার

প্রাথমিক জীবন

শেখ মোহাম্মদ সুলতান ১০ আগস্ট, ১৯২৩ সালে তৎকালীন পূর্ব বাংলা, ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশ) নড়াইলের মাসিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।[5][6] তার জন্ম হয়েছিল দরিদ্র কৃষক-পরিবারে। তার মায়ের নাম মোছাম্মদ মেহেরুননেসা। তার বাবা শেখ মোহাম্মদ মেসের আলী পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রী।[3][5] তবে কৃষিকাজই ছিল তার বাবার মূল পেশা, পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য ঘরামির কাজ করতেন।[7] সুলতান ছিলেন পরিবারের একমাত্র সন্তান।[6] শৈশবে পরিবারের সবাই তাকে লাল মিয়া বলে ডাকতো।[8]:১৪৫ বিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো সামর্থ্য তার পরিবারের না থাকলেও ১৯২৮ সালে নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে তাকে ভর্তি করানো হয়।[7] তবে মাত্র পাঁচ বছর অধ্যয়নের পর তিনি সেই বিদ্যালয়ে ছেড়ে বাড়ি ফিরে বাবার সহযোগী হিসেবে রাজমিস্ত্রীর কাজ শুরু করেন। এ সময় বাবার ইমারত তৈরির কাজ সুলতানকে প্রভাবিত করে এবং তিনি রাজমিস্ত্রীর কাজের ফাঁকে আঁকাআঁকি শুরু করেন। সুলতানের বাল্যবয়সের চরিত্র-গঠন সম্পর্কে আহমদ ছফা লিখেছেন:

কোনো কোনো মানুষ জন্মায়, জন্মের সীমানা যাদের ধরে রাখতে পারে না। অথচ যাদের সবাইকে ক্ষণজন্মাও বলা যাবে না। এরকম অদ্ভুত প্রকৃতির শিশু অনেক জন্মগ্রহণ করে জগতে, জন্মের বন্ধন ছিন্ন করার জন্য যাদের রয়েছে এক স্বভাবিক আকুতি। ...শেখ মুহাম্মদ সুলতান সে সৌভাগ্যের বরে ভাগ্যবান, আবার সে দুর্ভাগ্যের অভিশাপে অভিশপ্ত।[9]

১০ বছর বয়সে, যখন তিনি বিদ্যালয়ে পড়েন তখন আশুতোষ মুখার্জির ছেলে ড. শাম্যপ্রসাদ মুখার্জি নড়াইলে ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল পরিদর্শনে এলে সুলতান তার একটি পেন্সিল স্কেচ আঁকেন। শাম্যপ্রসাদ তার আঁকা স্কেচ দেখে বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন এবং এই পেন্সিল স্কেচের মাধ্যমেই শিল্পী হিসেবে সুলতানের প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে।[5]

কলকাতা আর্ট কলেজে পড়াশোনা

ছবি আঁকার প্রতিভার কারণে শৈশব থেকেই এলাকার জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের স্নেহ লাভ করেন সুলতান। ধীরেন্দ্রনাথের ভাইয়ের ছেলে অরুণ রায় তখন কলকাতা আর্ট স্কুলের ছাত্র। সেই অরুণ রায়ের কাছে সুলতান ছবি আঁকা শিখতে শুরু করেন।[8]:১৩৬

গতানুগতিক পড়াশোনার প্রতি সুলতানের আগ্রহ ছিল না কখনই। ১৯৩৮ সালে ক্লাস এইটে উঠে তিনি স্কুল ছেড়ে দেন। ছবি আঁকা শেখার জন্য কলকাতায় পাড়ি জমান। বয়স কম হবার কারণে তখন কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে পারেননি। কখনো ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের বাড়ি, কখনো তার ভাই সত্যেন রায়ের বাড়ি, কখনো তাদের অন্যান্য ভাইদের বাড়িতে থেকে সুলতান তিন বছর ছবি আঁকার চর্চা করেন।[5][8]:১৪১-১৪২

১৯৪১ সালে তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দেন। পরীক্ষায় অংশ নেয়া চারশো ছেলেমেয়েকে পনেরো মিনিটে ভেনাস মিলোর ছবি আঁকতে দেয়া হয়। সুলতান প্রথম হন, কিন্তু এন্ট্রান্স পাশ না থাকার কারণে তার ভর্তি নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। তখন ধীরেন্দ্রনাথ রায় বিষয়টা অবগত করেন শাহেদ সোহরাওয়ার্দীকে। সোহরাওয়ার্দী তখন প্রখ্যাত শিল্প সমালোচক এবং কলকাতা আর্ট স্কুলের পরিচালনা পরিষদের সদস্য। তার সাহায্যে সুলতান কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। তিনিই সুলতানকে পরামর্শ দেন ভর্তি হবার সময় কাগজপত্রে লাল মিয়া না লিখে শেখ মোহাম্মদ সুলতান লিখতে। সুলতানকে সোহরাওয়ার্দী সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকেন। তার অসাধারণ সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার সুলতানের জন্য সব সময় উন্মুক্ত ছিলো। কিছুকাল তার বাসায় ও তার ভাই শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বাসায় থেকে সুলতান পড়াশোনা করেছেন।[8]:১৪৩-১৪৫

কলকাতা আর্ট স্কুলের অন্যান্য ক্লাসে তখন জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমেদ, রাজেন তরফদার, আনওয়ারুল হকের মত মানুষেরা পড়াশোনা করতেন। ফলে তাদের সাথে সুলতানের যোগাযোগ ঘটে। ছাত্র হিসেবে সুলতান ভালো ছিলেন, এর পাশাপাশি মঞ্চনাটকে অভিনয় করেও প্রশংসা অর্জন করেন।[8]:১৪৬-১৪৭

১৯৪৩ সালে, তৃতীয় বর্ষে উঠে সুলতান আর্ট স্কুল ছেড়ে দেন।[8]:১৫০[10]

১৯৪০-এর দশকে

আর্ট স্কুল ছেড়ে সুলতান দেশভ্রমণে বের হয়ে পড়েন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাঁধাধরা জীবন এবং প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার কঠোর রীতিনীতি সুলতানের জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো না। তিনি ছিলেন বোহেমীয় জীবনাচারের অনুসারী। চেতনায় তিনি ছিলেন স্বাধীন এবং প্রকৃতিগতভাবে ছিলেন ভবঘুরে এবং ছন্নছাড়া। প্রকৃতিকে তিনি সবসময় রোমান্টিক কবির আবেগ দিয়ে ভালোবেসেছেন। আবার যান্ত্রিক নগরজীবনকে সেরকমই ঘৃণা করেছেন। ১৯৪৩ সালে তিনি খাকসার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। এর অব্যবহিত পরেই বেরিয়ে পড়েন এবং উপমহাদেশের পথে পথে ঘুরে তার অনেকটা সময় কেটে যায়। তখন ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। অনেক মার্কিন ও ব্রিটিশ সৈন্য ছিলো ভারতে। তিনি ছোট-বড় বিভিন্ন শহরে ঘুরে ঘুরে ছবি এঁকে তা সৈন্যদের কাছে বিক্রি করতেন। এভাবেই তিনি সেসময় জীবনধারণ করেছেন। মাঝে মাঝে তার ছবির প্রদর্শনীও হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি শিল্পী হিসেবে কিছুটা পরিচিতি লাভ করেন। কিন্তু সুলতানের চরিত্রে পার্থিব বিষয়ের প্রতি যে অনীহা এবং যে খামখেয়ালীপনা ছিলো তার কারণে সেই ছবিগুলো রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। সেগুলোর কোনো আলোকচিত্রও এখন পাওয়া যায় না। এছাড়া তিনি কখনও এক স্থানে বেশি দিন থাকতেন না। তিনি বলেন:[3]

তবে এটুকু জানা গেছে যে, সেসময় তিনি প্রাকৃতিক নৈসর্গ্য এবং প্রতিকৃতি আঁকতেন। তার আঁকা ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিলো ১৯৪৬ সালে সিমলায়[7][10]

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারতের জন্ম হয়। এই বিভক্তির পর এস এম সুলতান কিছু দিনের জন্য নিজ দেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসেন। এখানে কিছুদিন থেকেই করাচি চলে যান। সেখানে পারসি স্কুলের শিল্প শিক্ষক হিসেবে দুই বছর চাকুরি করেছিলেন। সেখানে চাকুরিরত থাকা অবস্থায় তার সাথে পরিচয় হয় চুঘতাই এবং শাকের আলীর মত বিখ্যাত শিল্পীদের। এর কিছু আগে ১৯৫০ সালে চিত্রশিল্পীদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানে নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো এবং বোস্টনে তার ছবির প্রদর্শনী হয়। এরপর লন্ডনেও তিনি প্রদর্শনী করেছিলেন।[11] ১৯৫৩ সালের অক্টোবরে তিনি আবার নড়াইলে ফিরে আসেন। তার কিছুদিন পর তিনি চলে আসেন চাচুঁড়ি পুরুলিয়া তে। এখানকার পরিত্যক্ত কৈলাসটিলা জমিদারবাড়িটি পরিষ্কার করে সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন নন্দনকানন প্রাইমারি স্কুল এবং নন্দনকানন ফাইন আর্টস স্কুল যা পরে পরিণত হয় চাচুঁড়ি পুরুলিয়া হাইস্কুল-এ। প্রশাসনের সহায়তায় স্কুল চলতে থাকে কিন্তু বন্ধ হয়ে যায় ছবি আঁকার ক্লাস। সুলতান দুঃখ পেয়ে আবার নড়াইলে চলে আসেন। এবার এসে তিনি শিশুশিক্ষার প্রসারে কাজ শুরু করেন যা নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিলো। শেষ বয়সে তিনি নড়াইলে শিশুস্বর্গ এবং যশোরে চারুপীঠ নামে দুটি শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন।

অনেকটা সময় তার নড়াইলেই কেটে যায়। ঢাকায় আধুনিক চিত্রশিল্পের বিকাশের সময়টায় তিনি প্রায় সকলের অজ্ঞাতেই ছিলেন। সত্তরের দশকের শুরুর দিকে তিনি নড়াইল জেলার পুরুলিয়া গ্রামে থাকতেন। ১৯৭৬ সালের আগ অবধি পুরুলিয়া গ্রামে তার যাওয়া-আসা ছিলো। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি শিল্পরসিকদের চোখের আড়ালেই থেকে যান। সত্তরের দশকের মধ্যভাগে তার কিছু শুভানুধ্যায়ী তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। এখানে এসে তিনি কিছু ছবি আঁকেন। তার আঁকা এইসব ছবি নিয়ে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এক প্রদর্শনীর আয়োজন করে, এবং এই প্রদর্শনীর মাধ্যমেই তিনি নতুন করে শিল্পসমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।[7][10] অবশ্য আশির দশক থেকে তিনি আবার নড়াইলেই থাকতে বাধ্য হন। তার কাছে যেসব মানুষ এবং শিশু আশ্রয় নিয়েছিলো তাদের জন্য তিনি নিজের ঘর ছেড়ে দেন। জীবজন্তুর প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি একটি চিড়িয়াখানা তৈরি করেন এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে শিশুদের জন্য সুন্দরী কাঠ দিয়ে একটি বড় আকারের নৌকাও তৈরি করেছিলেন। তার ইচ্ছা ছিলো শিশুরা সেই নৌকায় চড়ে সমুদ্র পরিভ্রমণে বের হবে আর শিল্পচর্চার উপকরণ খুঁজে পাবে।[3] আশির দশকের শেষদিকে তার স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে। ১৯৯৪ সালে ঢাকার গ্যালারি টোনে তার সর্বশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।[7] সে বছরেরই আগস্ট মাসে নড়াইলে ঘটা করে তার জন্মদিন পালন করা হয়।

শিল্পকর্ম

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদে সুলতানের আঁকা বিখ্যাত চিত্রকর্ম "প্রথম বৃক্ষরোপন"

পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় আধুনিক চিত্রকলার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছিলো। অনেক শিল্পীই সেখানে নব নব শৈলী, গড়ন এবং মিডিয়া নিয়ে উপস্থিত হচ্ছিলেন। কিন্তু এস এম সুলতান সেসময়ও নড়াইলে থেকে যান, অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে। এর কারণ অবশ্য গ্রামীণ জীবনের প্রতি তার চিরন্তন আকর্ষণ এবং সহমর্মিতা। তার শিল্পকর্মের স্বরূপটিও খুঁজে পাওয়া যায় এই গ্রামীণ জীবনযাত্রার প্রেক্ষাপটে। তার সে সময়কার ছবিগুলোতে গ্রামীণ কৃষকদের দেখা যায় পেশীবহুল এবং বলশালী হিসেবে। এর কারণ হিসেবে তার বক্তব্য হলো:[3]

তার ছবিতে গ্রামীণ রমণীদের দেখা যায় সুডৌল ও সুঠাম গড়নে। নারীর মধ্যে উপস্থিত চিরাচরিত রূপলাবণ্যের সাথে তিনি শক্তির সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। একই সাথে তার এ ছবিগুলোতে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের শ্রেণী-দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির কিছু ক্রূর বাস্তবতা উঠে এসেছে। তার এরকম দুটি বিখ্যাত ছবি হচ্ছে হত্যাযজ্ঞ (১৯৮৭) এবং চরদখল (১৯৮৮)।

১৯৭৬ সালে তার আঁকা শিল্পকর্ম নিয়ে শিল্পকলা একাডেমীর প্রদর্শনীতে তার ছবির মহিমা নতুন করে প্রস্ফুটিত হয়। এই ছবিগুলোর মধ্যে দেখা যায় বিশ্বের কেন্দ্র হচ্ছে গ্রাম আর সেই কেন্দ্রের রূপকার কৃষককে আপন মহিমায় সেখানে অধিষ্ঠিত দেখা যায়। গ্রাম ও গ্রামের মানুষ ছিলো তার শিল্পকর্মের অনুপ্রেরণা আর উপকরণ ছিলো কৃষক এবং কৃষকের জীবন চেতনা। এস এম সুলতান তেলরঙ এবং জলরঙ-এ ছবি আঁকতেন৷ পাশাপাশি রেখাচিত্র আঁকতেন । আঁকার জন্য তিনি একেবারে সাধারণ কাগজ, রঙ এবং জটের ক্যানভাস ব্যবহার করেছেন। এজন্য তার অনেক ছবিরই রঙ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো, যদিও এসবের প্রতি তিনি তেমন ভ্রূক্ষেপ করতেন না। নড়াইলে থাকাকালীন সময়ে তিনি অনেক ছবি কয়লা দিয়ে একেছিলেন তবে সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়৷

এস এম সুলতান আধুনিকতার একটি নিজস্ব সংজ্ঞা গ্রহণ করেছিলেন। তার তেমন কোনো অনুসারী ছিলোনা যারা একই সংজ্ঞা মেনে শিল্পচর্চা করতেন। একারণেই তার প্রতিষ্ঠিত আধুনিকতার স্বরূপ নিয়ে নতুন কোনো ধারার সৃষ্টি হয়নি। কেউ তার মতো করে আধুনিকতার ব্যাখ্যাও দেননি। এছাড়া তার মতো মাটির জীবন তখনকার কোনো শিল্পী যাপন করেননি। তার কাছে আধুনিকতার সংজ্ঞা কেমন ছিলো তা বলতে গিয়ে বাংলাপিডিয়ায় তার জীবনীর লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখেছেন:[12]

তাঁর কাছে অবয়বধর্মিতাই প্রধান। তিনি আধুনিক, বিমূর্ত শিল্পের চর্চা করেননি; তাঁর আধুনিকতা ছিলো জীবনের শাশ্বত বোধ ও শিকড়ের প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ফর্মের নিরীক্ষাকে গুরুত্ব দেননি, দিয়েছেন মানুষের ভেতরের শক্তির উত্থানকে, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এবং ঔপনিবেশিক সংগ্রামের নানা প্রকাশকে তিনি সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপন করেছেন। এটাই তাঁর কাছে ছিলো 'আধুনিকতা', অর্থাৎ তিনি ইউরো-কেন্দ্রিক, নগর নির্ভর, যান্ত্রিকতা-আবদ্ধ আধুনিকতার পরিবর্তে অন্বেষণ করেছেন অনেকটা ইউরোপের রেনেসাঁর শিল্পীদের মতো মানবের কর্মবিশ্বকে।

শিল্পী এস এম সুলতান শেষ জীবনে বলে গিয়েছেন:[3]

মৃত্যু

এস এম সুলতান ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোরে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।[1]

প্রদর্শনীসমূহ

একক প্রদর্শনী

সুলতানের জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর দেশে-বিদেশে তার বহু একক চিত্র প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছে।[5] এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে তার ১৭টি একক প্রদর্শনী হয়েছিলো।[2]

বছরস্থানতথ্যসূত্র
১৯৪৬সিমলা, ভারতপ্রদর্শনী উদ্বোধন করেন কর্পূরীতলার মহারাজা[5]
১৯৪৮লাহোর, পাকিস্তানপ্রদর্শনী উদ্বোধন করেন ফিরোজ খান নূন[5]
১৯৪৯করাচী, পাকিস্তানপ্রদর্শনী উদ্বোধন করেন ফাতেমা জিন্নাহ[5]
১৯৫০ইনিস্টিটিউট অব এডুকেশন, নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র[5]
ওয়াইএমসিএ, বোস্টন, যুক্তরাষ্ট্র[5]
শিকাগো উন্টারন্যাশনাল হাউজ, শিকাগো, যুক্তরাষ্ট্র[5]
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়, মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র[5]
১৯৭৬বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা, বাংলাদেশবাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর সুলতানের প্রথম একক প্রদর্শনী[5]
১৯৮১এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী, ফুকুওকা মিউজিয়াম, জাপান
১৯৮৭গ্যোটে ইনস্টিটিউট, ঢাকা, বাংলাদেশ[5]
১৯৯৪গ্যালারি টোন, ঢাকা, বাংলাদেশ

যৌথ প্রদর্শনী

বছরস্থানতথ্যসূত্র
১৯৫৬হ্যামস্টিড, লন্ডন, যুক্তরাজ্যপাবলো পিকাসো, সালভাদর দালি, জন ব্রাক, পল ক্লী, জন মার্টিন প্রমুখের সাথে যৌথ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।[2][5]
১৯৭৫জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা, বাংলাদেশ[5]
১৯৭৬জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা, বাংলাদেশ[5]

পুরস্কার এবং সম্মাননা

তিনি ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের কাছ থেকে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার গ্রহণ করেন।[5] তিনি ১৯৫১ সালে নিউ ইয়র্কে, ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন কর্তৃক আয়োজিত সেমিনারে সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন৷ এছাড়াও ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে আন্তর্জাতিক জুরী কমিটির অন্যতম সদস্য মনোনীত হন৷[2]

বছরপুরস্কারআয়োজকটীকা
১৯৮২একুশে পদকবাংলাদেশ সরকারচারুকলায় অবদান[5]
১৯৮৫চারুশিল্পী সংসদ সম্মানবাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ[5]
১৯৯৩স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারবাংলাদেশ সরকার[5]

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে

আদম সুরত-এর পোস্টার

আদম সুরত

১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত সাত বছর ধরে সুলতানের উপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হয় আদম সুরত। তারেক মাসুদের প্রযোজনা এবং পরিচালনায় এই প্রামাণ্যচিত্রে সুলতানের দৈনন্দিন কর্মজীবন তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলার সংস্কৃতি এবং কৃষিচিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।[13]:১৩-১৬

অন্যান্য

এস এম সুলতানের জীবন এবং কর্মের ওপর ২০১০ সালে ফাহিম মিউজিকের ব্যানারে লাল মিয়া নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন আমিরুল ইসলাম। এতে সুলতানের স্মৃতিবিজড়িত নড়াইলের বিভিন্ন স্থান, চিত্রা নদী, শিশুস্বর্গ, বিভিন্ন সময়ে তার আঁকা চিত্র ও দুর্লভ আলোকচিত্র রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে সুলতানের পাঁচ মিনিটের একটি সাক্ষাৎকার।[14]

আরো দেখুন

তথ্যসূত্র

  1. "এস এম সুলতানের মৃত্যুবার্ষিকী আজ"প্রথম আলো। ১০ অক্টোবর ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ২ জুলাই ২০২০
  2. বাংলাদেশ সরকারের ক্যাবিনেট ডিভিশন
  3. রশীদ, হারুনুর (সেপ্টেম্বর ১৯৯২)। "সাক্ষাতকার: অন্তরঙ্গ আলোকে শিল্পী এস, এম সুলতান"। নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট। ঢাকা। পৃষ্ঠা ৩৩-৩৮।
  4. "এস এম সুলতানের মৃত্যুবার্ষিকী আজ"প্রথম আলো। ১০ অক্টোবর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ২ জুলাই ২০২০
  5. খান, সাদেক (জুন ২০০৩)। "জীবনবৃত্তান্ত"। এস. এম. সুলতানঢাকা: বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী। পৃষ্ঠা ১৩৫।
  6. খান, সাদেক (জুন ২০০৩)। "পটুয়া-বাউল শেখ মুহাম্মদ সুলকান"। এস. এম. সুলতানঢাকা: বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী। পৃষ্ঠা ৩১।
  7. গাফফার, আবদুল (৫ আগস্ট ২০১৮)। "প্রাণ ও প্রকৃতির শিল্পী"প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ৮ জুলাই ২০২০
  8. হাই, হাসনাত আবদুল (ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। সুলতান (দ্বিতীয় সংস্করণ)। ৬১ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা ১০০০: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। আইএসবিএন 978-984-506-219-0।
  9. ছফা, আহমদ (ফেব্রুয়ারি ১৯৮১)। "বাংলার চিত্র ঐতিহ্য: সুলতানের সাধনা"। বাঙালি মুসলমানের মনবাংলা একাডেমি
  10. মজুমদার, মোবাশ্বির আলম। "এক ভবঘুরের মহাজাগতিক পরিভ্রমণ"কালি ও কলম। সংগ্রহের তারিখ ৮ জুলাই ২০২০
  11. হোক, লটি; সান্ডারেসন, সানজুকটা (৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। "Journeying through Modernism: Travels and Transits of East Pakistani Artists in Post-Imperial London"ব্রিটিশ আর্ট স্টাডিজ (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৮ জুলাই ২০২০
  12. "বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধ"। ১৬ এপ্রিল ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০১০
  13. মাসুদ, তারেক (ফেব্রুয়ারি ২০১২)। "যেভাবে 'আদম সুরত'"। চলচ্চিত্রযাত্রা। কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫: প্রথমা প্রকাশনআইএসবিএন 978-984-33-3886-0।
  14. "এস এম সুলতানের ওপর প্রামাণ্যচিত্র"দৈনিক প্রথম আলোঢাকা। জানুয়ারি ২৭, ২০১০। সংগ্রহের তারিখ অক্টোবর ১৩, ২০১০

বহিঃসংযোগ

This article is issued from Wikipedia. The text is licensed under Creative Commons - Attribution - Sharealike. Additional terms may apply for the media files.